সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, কক্সবাজার শহর সংলগ্ন বাঁকখালী নদীতে স্পার নির্মাণ ও বালির বস্তা দিয়ে বাঁধ নির্মাণের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। এতে নদীর একপাড়ে চরের সৃষ্টি হলেও অপর পাড়ের বিশাল জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বাঁকখালী নদীর ওপারে খুরুস্কুল ও পিএমখালীতে একের পর এক স্পার নির্মাণ ও বালির বস্তা দিয়ে বাঁধ নির্মাণের কারণে মাত্র ৫ বছরেই শহরের গোদারপাড়া, এসএমপাড়াসহ চৌধুরীপাড়ার অন্তত ৩০০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে বসতবাড়ী হারা হয়ে গেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য কমপক্ষে ২ হাজার কোটি টাকা হবে বলে জানান নদীপাড়ের বাসিন্দা মুজিবুর রহমার।
জয়নাল আশংকা প্রকাশ করেন বলেন, নদীর ওপারে স্পার ও বাঁধ নির্মাণ অব্যাহত থাকায় আসছে বর্ষা মৌসুমে আরো বিলীন হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই এবং নদীর এপারের আরো বিস্তীর্ণ ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। বর্তমানে ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত ফিশপার্ক নামক একটি ১৫০ কোটি মূল্যের গলদা চিংড়ি ও তেলাপিয়া হ্যাচারীসহ কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ।
বাসিন্দা আবুল মিয়া জানান, ইতোমধ্যে নদীপাড়ের বিভিন্নস্থানে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে স্থানীয়দের মাঝে আতংকাবস্থা বিরাজ করছে। এই ঘটনার জের ধরে যে কোন মুহুর্তে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে যেতে পারে।
নদীপাড়ের প্রবীণ বাসিন্দা আলী আকবর জানান, একসময় আলীর জাঁহাল থেকে গোদারপাড়া হয়ে ছনখোলা ঘাট পর্যন্ত ২৫ ফুট চওড়া একটি সড়ক ছিল। যা এখন নদীগর্ভে।
বাসিন্দ কাদের জানান, নদীতীরে অব্যাহত ভাঙনের কারণে নদী সংলগ্ন বড়ুয়া পাড়া, পেঁতা সওদাগর পাড়া, চান্দেরপাড়া, এসএমপাড়া, গোদারপাড়া ও মাঝিরঘাট পর্যন্ত এলাকার প্রায় ২ হাজার একর চাষযোগ্য জমি লবণাক্ত পানিতে ডুবে থাকে। এতে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।
শহরের গোদারপাড়ার একাধিক বাসিন্দা জানান, মাত্র এক যুগ আগেও গোদারপাড়ার প্রায় ৫ হাজার পরিবার ছিল। এখানে ছিল স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, মক্তব ও কবরস্থান। কিন্তু এখন কিছুই নেই। বর্তমানে মাত্র ৩০-৪০টি বাড়ী নামমাত্র টিকে আছে পাড়াটি। আসছে বর্ষা মৌসুমে বাকী বসতবাড়ীসমূহও নদীগর্ভে বিলীনের আশংকায় রয়েছেন তারা।
তারা আরো জানান, মাত্র গত ৩ বছরেই এই এলাকার মৌলভী ফজর আহমদ, মাষ্টার মোহাম্মদ হাসান, মাহমুদুন্নবী, নুরুল কবীরসহ কয়েকটি বনেদী পরিবার ভিটেবাড়ীসহ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
তারা আরো বলেন, নদীর ওপাড়ে স্পার ও বাঁধ দেওয়া বন্ধ করে দিলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ এবং এই এলাকার হাজার হাজার মানুষ কর্ম ও বাসস্থান ফিরে পাবে।
মোহাম্মদ আমিন জানান, বাঁকখালী নদীর এপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোন পোল্ডার নেই। এই এলাকাকে পাউবো পোল্ডারের আওতাভূক্ত করে শহর রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী। তিনি আরো বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) শহরের পেশকার পাড়া পর্যমআওতাভূক্ত ত রয়েছে। কিন্তু শুধু মাত্র গোদারপাড়া, এসএমপাড়া এলাকাটিই পাউবো পোল্ডারের আওতাভূক্ত নয়। যতটুকু জানা যায় পাউবো পোল্ডারের আওতাভূক্ত না করার জন্য উক্ত চিহৃিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে যোগসাযোশ গঠে তুলেছে পাউবোর কর্মকর্তারা।
তিনি জানান, নদীর ওপারে কয়েকজন লোভী প্রভাবশালী ব্যক্তি নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যমে চরের জমি হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই নদী তীরে অসংখ্য বাঁধ ও স্পার নির্মাণ করছে। গত কিছুদিন আগেও ২৫ টি স্পার নির্মাণ করা হয়েছে।
বাসিন্দা সুলতান জানান, শহরের এসএমপাড়া থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত এলাকার ওপারে ইতোমধ্যে ৩০টির মত স্পার ও বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
এদিকে চিহৃিত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জানান, নদীর তীর ভাঙনের কারণে তাদের চিংড়ি ঘের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে ওপারে চর জেগেছে। তাই আমাদের সম্পদ হেফাজত করতেই নদীপাড়ে স্পার ও বাঁধ নির্মাণে বাধ্য হয়েছি এবং তারাই স্পার ও বাঁধ দেওয়া কারণে গোদারপাড়া বাসীরা তাদের সম্পদ রক্ষা করতে পাচ্ছে বলে দাবী করেন। অপরদিকে সরেজমিনে দেখা যায় যে, চিহৃিত প্রভাবশালী ব্যক্তির দাবীর সাথে বাস্তবে কোন মিল নেই।
প্রকৃত বিষয় হচ্ছে, শাক দিয়ে মাছ ডাকার অপ্রচেষ্টায় ব্যস্ত রয়েছে উক্ত প্রভাবশালীরা।
বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, চিহৃিত প্রভাবশালীদের স্পার ও বাঁধা দেওয়ার কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে উক্ত এলাকার হাজার হাজার বসত বাড়ি, ফসলি জমি এবং পরিবেশ বিনষ্ট করেছে। তা থেকে বাঁচার জন্য উক্ত প্রভাবশালীরা মুখ ভরা মিথ্যা কথা বলছে। তাছাড়া বর্তমানে খুরুশস্কুল এলাকায় যে চরটি জেগে উঠেছে তাও গোদারপাড়া, এসএমপাড়ার বিলীন হওয়া এলাকার। উক্ত এলাকায় যেকোন সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সম্ভবনা রয়েছে। এলাকাবাসী প্রশাসনকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে তদন্ত পূর্বক আইনী ব্যস্ত নিয়ে চিহৃিত প্রভাবশালীদের কালো থাবা থেকে পরিবেশ ও শত বছরে ঐতিহ্যপূর্ণ এলাকাটি রক্ষাকল্পে অনতি বিলম্বে অবৈধ স্পার সমূহ অপসারণ করার জোর দাবী জানান। অন্যথায় আগামী বর্ষায় সেই ৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের মত ভয়াবহ জলোচ্ছাস অথবা বর্ষার পাবনে উক্ত এলাকার বাকি অংশও কোন চিহৃ খুজেঁ পাওয়া যাবে না বলে ধারণা অভিজ্ঞ মহলের। উলেখ্য যে, বাঁকখালী নদী ভাঙ্গন ও অবৈধ স্পার এবং বাঁধ দেওয়ার বিষয় নিয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সংবাদ ও পত্রিকায় প্রতিবেদন ছাপানোর পরও প্রশাসনের কোন নজর দেয়নি উক্ত নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকা।
0 Responses to কক্সবাজারে স্পার ও বালির বাঁধ দিয়ে নদী দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে প্রভাবশালীরা